বাস্তবতা যাচাইয়ে আরব দেশগুলোর ব্যর্থ মার্কিন সুরক্ষা পরিত্যাগের সময়
ড. শাহজাহান খান OAM
শক্তিশালী ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আক্রমণের একটি স্পষ্ট ফলাফল হলো: আরব দেশগুলোর সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ। বাস্তবে, পুরো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (GCC) দেশগুলোতে এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের ধারাবাহিক ড্রন ও মিসাইল হামলা থেকে কার্যত অরক্ষিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন সেনাবাহিনী নিজেদের যুদ্ধ জাহাজ, সামরিক ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই রক্ষা করতে পারেনি, আরবদের সুরক্ষা তো দূরের কথা। উল্লেখ্য, আরব দেশগুলো সরাসরি ইরানের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল না; বরং এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু ছিল, কারণ সেগুলো ব্যবহার করেই মার্কিন সেনারা ইরানের ওপর মারাত্মক আক্রমণ চালিয়ে ছিল।
ইসরায়েল-প্ররোচিত এই অযৌক্তিক ও বেআইনী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা প্রমাণ করেছে যে তারা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আরব দেশগুলোকে রক্ষা করতে অক্ষম হলেও ইসরায়েলের সুরক্ষায় নিবেদিত। তবুও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার বলেছেন যে এই অবৈধ ও অননুমোদিত যুদ্ধের খরচ আরব দেশগুলিকেই বহন করতে হবে। ইসরায়েলের জায়োনিস্ট প্রধানমন্ত্রী-এর প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালায়, যাতে এই অঞ্চলের শেষ শক্তিশালী দেশটিকেও ধ্বংস করে ইসরায়েলকে আরব বিশ্বের একচ্ছত্র শক্তিতে পরিণত করা যায়। তবে, কেন এর যাবতীয় খরচা দিতে হবে আরব রাজা-বাদশাদের?
এটি কোনো আকস্মিক হামলা নয়; বরং জায়োনিস্ট রাষ্ট্রের দীর্ঘমিয়াদী বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য হলো ঐ অঞ্চলের সব বড় মুসলিম দেশকে ধ্বংস করে “গ্রেটার ইসরায়েল” প্রতিষ্ঠা করা। এবং এটা আমেরিকার শক্তিশালী সেনাবাহিনীর মাধ্যমে করাই ছিল ইসরায়েলের পরিকল্পনা। ২০০১ সালে সাবেক ন্যাটো কমান্ডার জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্ক প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সাতটি মুসলিম দেশ ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিল—শুধুমাত্র তাদের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার কারণে। সেই অনুযায়ী, প্রথমে ইরাক, এরপর সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, ইরান, সোমালিয়া ও সুদানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বছরের পর বছর ধরে পুরো বিশ্ব—শুধু আরবরা নয়—নীরবে দেখেছে কীভাবে ইসরাঈল কর্তৃক এই দেশগুলো একে একে আক্রমণ ও ধ্বংস করা হয়েছে, কোনো কার্যকর প্রতিবাদ ছাড়াই। যেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাতিসংঘ নয়, বরং আরব দেশসমুহ ও OIC-এর কাছ থেকেই অনুমতি ছিল যে, যে কোনো মুসলিম দেশকে “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা যাবে, হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম বেসামরিক মানুষ হত্যা করা যাবে, অথচ এসব জঘন্য ধংশজঞের সময় তথাকথিত “সভ্য” বিশ্ব সম্পূর্ণ নীরব থাকবে।এরপর আসে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ঐ জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেয়। পশ্চিমা বিশ্ব, এমনকি তাদের মূলধারার গণমাধ্যমও, “ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার” ও “আত্মরক্ষার অধিকার” এই ভ্রান্ত স্লোগানের আড়ালে ফিলিস্তিনিদের পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞের দিকে চোখ বন্ধ করে রাখে। এখন স্পষ্ট যে সাতটি মুসলিম দেশ ধ্বংসের পরিকল্পনা ছিল বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও পশ্চিমা শক্তির সমর্থন ব্যবহৃত হয়েছে।যদি এই ধংসকৃত দেশগুলো একত্রে নিজেদের রক্ষা করত এবং একে অপরকে সমর্থন দিত, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু ইরাকে “গণবিধ্বংসী অস্ত্র” থাকার মিথ্যা অভিযোগে ধ্বংসের সময় কেউ এ নগ্ন আক্রমণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেনি। কেউ কেউ বরং আমেরিকার গনহত্যাকে সমর্থন দিয়েছে। লিবিয়া ধ্বংস হলেও সবাই নীরব ছিল। একই পরিস্থিতি সিরিয়া, লেবানন, সুদান, সোমালিয়া এবং এখন ইরানের ক্ষেত্রেও।
এই অবস্থা আমাকে একটি বিখ্যাত পুরোনো গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়—একটি বনে ‘তিনটি গরু ও একটি সিংহ’-এর গল্প। একটী ক্ষুধার্ত সিংহ এবং লাল, সাদা ও কালো বর্নের তিনটি গরু। এই তিনটি গরুর কাউকেই সিংহ আক্রমণ করতে পারছিল না, কারণ তারা একসঙ্গে থাকায় অনেক শক্তিশালী ছিল। তাই সিংহটি কৌশল অবলম্বন করল। সে লাল ও কালো গরুকে বলল, “সাদা গরুটি দূর থেকে খুব চোখে পড়ে, তাই সে তোমাদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে, যদি সে তোমাদের সঙ্গে থাকে।” লাল ও কালো গরু সিংহের এই ‘যুক্তি’কে গ্রহণযোগ্য মনে করল এবং নিজেদের ‘দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার’ কথা ভেবে সাদা গরুটিকে দল থেকে বের করে একা ফেলে দিল। পরিকল্পনা মত চতুর সিংহটি তাকে সহজেই একা পেয়ে খেয়ে ফেলল।
কয়েক মাস পরে, সিংহটি লাল গরুর কাছে এসে বলল, “কালো গরুর রঙ তোমার আর আমার থেকে আলাদা; আমাদের রঙ তো একই রকম।” সে লাল গরুকে বোঝাল যেন সে কালো গরুকে একা ছেড়ে দেয়, যাতে তারা দু’জন শান্তিতে জঙ্গলে থাকতে পারে। ফলে, কালো গরুটি একা হয়ে পড়লে সিংহ সেটিকেও হত্যা করে খেয়ে ফেলল। কয়েক সপ্তাহ পর, সিংহ তার শেষ লক্ষ্য—লাল গরুটিকে একা পেয়ে হত্যা করে খেয়ে ফেলল, কারণ সে তখন সম্পূর্ণ একা এবং তাকে রক্ষা করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। আপনি কি লক্ষ্য করছেন—এই গল্পের সঙ্গে বর্তমান আরব দুনিয়ার বাস্তবতার সাথে কোনো মিল আছে কি না?ফিলিস্তিন ও ইরানের পর, “গ্রেটার ইসরায়েল” পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে সৌদি আরব। যদি ইরান ধ্বংস হয়, তখন তাদের রক্ষার আর কেউ থাকবে না। তাই এখনই আরব ও মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বিরল সুযোগ ও মোক্ষম সময়—ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চাপান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশ না নিয়ে জায়োনিস্ট আগ্রাসন থামানো। অন্যথায়, মুসলিমদের পর খ্রিস্টানরাও ইসরায়েলের আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে—ঠিক গল্পের সিংহের মতো, যে কৌশলে একে একে সবাইকে শিকার করেছিল।
সত্যি বলতে, সম্প্রতি যুদ্ধের আগ পর্যন্ত আমি নিজেও জানতাম না যে কাতার (আল উদেইদ), কুয়েত (ক্যাম্প আরিফজান), সংযুক্ত আরব আমিরাত (আল ধাফরা), বাহরাইন (NSA বাহরাইন), সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের এত ব্যাপক ও কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এসব ঘাঁটি গোয়েন্দা তৎপরতা, বিমান কমান্ড, লজিস্টিকস, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নামে মূলত ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। সতেরোটি মার্কিন ঘাটি আক্রমণ করে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, এসব প্রতিরক্ষা স্থাপনা বাস্তবে অকার্যকর—যদিও এসব নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবস্থানরত সেনাকর্মীদের বেতনের জন্য আরব দেশগুলো থেকে আমেরিকা ও ইহুদী ব্যাবসায়ীরা বিপুল অর্থ আদায় করেছে।যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মুসলিম বিশ্বে নানা “সন্ত্রাসী” ও চরমপন্থী গোষ্ঠী তৈরি ও অর্থায়ন করে, গোপনে আরবদের অর্থ ব্যবহার করে তাদের অস্ত্র দেয়, এবং সেই অজুহাতে নিরাপত্তার নামে আরও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে—যার মাধ্যমে আরবদের থেকে আরও অর্থ আদায় করা হয়। মূলতঃ ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার্থে ও আমেরিকার আধিপত্য বিস্তারের জন্য ঐসব ঘাটি নির্মাণ করা হয়।ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ ছিল একটি শান্তিপূর্ণ দেশের ওপর নগ্ন আগ্রাসন, যখন দেশটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর তত্ত্বাবধানে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক গবেষণার অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছিল। এখন একটি সহজ প্রশ্ন ওঠে—ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারলে ইরানের কেন থাকবে না? আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শান্তির জন্য প্রকৃত হুমকি কে—যে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যুদ্ধ করেছে, নাকি অন্য কেউ?
বর্তমান যুদ্ধে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে যাতে ইরান সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ না হয়। হরমুজ প্রণালী ছয় সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশ্বনেতাদের উচিত একত্রিত হয়ে এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসরায়েলের লাগাতার যুদ্ধনীতি চিরতরে বন্ধ করা।মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এখন উপলব্ধি করা উচিত—যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে পারবে না এবং চায়ও না। তথাকথিত “সন্ত্রাসবাদ” ও “নিরাপত্তা” খেলার অংশ হয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করার আর প্রয়োজন নেই। ইরান যে অভূতপূর্ব সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে, এখন ঐ আঞ্চলের দেশগুলো যদি পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসে—পাকিস্তান ও তুরস্কসহ—তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে এবং জনগণের কল্যাণে সামরিক খাত থেকে বাচান বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এভাবেই পরর্নিভরতা কাটিয়ে, আত্মশক্তি অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে।
ড. শাহজাহান খান OAM, এমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।