রাস্তার আন্দোলনে নয়, আইন মেনেই হবে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও গ্রাহকদের বিক্ষোভের মুখে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই রাস্তার কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না।
সোমবার (১ জুন) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। মুখপাত্র বলেন, ‘দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো ইস্যুতে যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিক্ষোভ প্রদর্শন ও নিজস্ব মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ধরণের আবেগ, বাইরের অহেতুক চাপ বা রাস্তার আন্দোলনের ভিত্তিতে নয়, বরং আমানতকারীদের স্বার্থ ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের কঠোর বিধান অনুসারেই সব সিদ্ধান্ত নেবে।’
ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আরিফ হোসেন খান বলেন, বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো চিহ্নিত ঋণখেলাপি ব্যক্তি কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ডিরেক্টর বা পরিচালক পদে আসীন হতে পারেন না। সম্প্রতি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে একজন বিশেষ ব্যক্তির নামে প্রায় তিন কোটি টাকার খেলাপি ঋণ থাকার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বিশেষ পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী খেলাপি অবস্থায় কারও কোনো ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই এবং নতুন কোনো নিয়োগের আগে এসব সংবেদনশীল বিষয় কঠোরভাবে যাচাই করা এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং নতুন চেয়ারম্যানকে প্রতিহতের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গ্রাহক-পুলিশ সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ ও জলকামান নিক্ষেপের ঘটনার প্রেক্ষাপটে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন এই মুখপাত্র। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সম্ভাব্য বড় ধরণের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় ইসলামী ব্যাংকের আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড সভাটি সশরীরে না করে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম তথা জুম অ্যাপের মাধ্যমে আয়োজনের বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভবনের বাইরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের হলেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গ্রাহকদের আমানতের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর—কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা মাস্তানি বরদাস্ত করা হবে না। ব্যাংক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের সময় কোনো রাজনৈতিক বা অদৃশ্য চাপের মুখে পড়লে তা সরাসরি গভর্নরকে জানাতে বলা হয়েছে; এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে গভর্নর নিজেই বিষয়টি শক্ত হাতে মোকাবিলা করবেন।
কোনো ব্যাংককে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্র্যান্ডিং বা চিহ্নিত করা মোটেও সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন আরিফ হোসেন খান। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ব্যাংক যদি একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তাহলে তা ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও টেকসই পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিক্ষোভ ও কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে যে, কোনো ব্যাংক বিশেষ কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সংকটে পরিণত হচ্ছে কি না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কোনো ব্যাংকই দেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না এবং এই ধরণের কুৎসিত রাজনৈতিক পরিচয় একটি ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের লাল সংকেত।