সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ রাখতে দাতা সংস্থা ও হাইকমিশনের ভূমিকা
ভিক্টর ক্রিলোভা: বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভারতীয় ‘বিশেষ সংস্থার’ অলিখিত চেইন শিরোনামে গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। অলিখিত দৃশ্যমান চেইনের আর্থিক উৎস খুঁজতে গিয়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের পাশাপাশি সামনে এসেছিল এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) নাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছছিল, এডিবির রেফারেন্সে বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ, বদলি, সরকারি কন্ট্রাক্টসহ নানা বাণিজ্যে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক অর্থ ও ক্ষমতার মালিক হয়ে ওঠে। এডিবির সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশের হাত ধরেই আসতো তাদের ফান্ডিং। যার পেছনে ছিলেনে আরো এক ব্যক্তি ও ভারতীয় হাইকমিশন। এডিবির এক ইনসাইডারের দেওয়া তথ্য থেকে এই প্রতিবেদনে সে বিষয়টিই তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মধ্যে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার নেপথ্যে অনেক মহলের ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছু দাতা সংস্থার ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না বলে এডিবির ঐ ইনসাইডার দাবি করেন। তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের পর ইউকে এইড, সুইজারল্যান্ডের এসডিসি, ভারতীয় হাইকমিশনের কথা অনেকেরই মনে আছে। ট্রেনিং ও কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে এরা মুন্নি সাহা, জ ই মামুন, নাইমুল ইসলাম খানের এক চক্র তৈরি করেছিল। গণমাধ্যম ক্যু কিভাবে করতে হয় এবং তার কুফল গণজাগরণ মঞ্চে বা শাপলা চত্ত্বরের সময় দেখা গেছে।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে যখন ভারতীয় নাগরিক মনমোহন প্রকাশ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্ক শীতল। এডিবির মনমোহন সুপরিকল্পিতভাবে দেশের গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ভারতীয় এজেন্ডা পূরণে বিশেষ মনোযোগী হন।
ইনসাইডার জানান, ২০১৮ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৭১ টিভি, এটিএন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ভোরের কাগজসহ বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালকে টার্গেট করা হয়। এডিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা গোবিন্দ বরকে (ডেইলি স্টার ও জনকন্ঠের সাবেক সাংবাদিক) বিশেষভাবে ক্ষমতা দেওয়া হয় এই কাজের জন্য। সাথে সহায়তায় ছিলেন তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা ফাতেমা ইয়াসমিনকে (পরবর্তীতে ইআরডি সচিব, বর্তমানে এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট)।
এ ছাড়াও আশফাক, ফারজানা রুপা, মিথিলা, শাকিল আহমেদ, প্রভাষ আমিন, শ্যামল দত্ত, ফরিদ কবির, আলফ্রেন্ড খোকনসহ বড় একটি চক্র তৈরি করা হয় বলে দাবি করা হয়। এডিবির রেফারেন্সে বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ, বদলি, সরকারি কন্ট্রাক্ট ইত্যাদি বাণিজ্যে এই সাংবাদিকরা অর্থ ও ক্ষমতার মালিক হয়ে ওঠেন। সর্বশেষ কালবেলা ও সন্তোষ শর্মাকে দিয়ে প্রথম আলোর জায়গা দখলের প্রকল্প হাতে নেয় গোবিন্দ বর। অত্যন্ত শক্তিশালী এক চক্রকে এডিবি ও ভারতীয় হাইকমিশন পৃষ্ঠপোষক করেছে, যার মধ্যে ছিল, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান পরিষদ, ইসকন, গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, সন্তোষ শর্মা, শ্যামল দত্ত, গোবিন্দ বর, সুভাষ সিংহ, জ ই মামুন, প্রথম আলোর আদালত প্রতিবেদক (যার নাম মনে করতে পারেননি তথ্যদাতা)। এছাড়াও ক্র্যাব ও ডিপ্লোমেটিক রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে ভারতীয় হাইকমিশন ও এডিবি বলেও জানান তিনি।
এডিবির প্রকল্পের পাশাপাশি তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির খবর গোবিন্দ বর প্রকাশ হতে দিত না, যেমন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ভেঙে পথচারীর মৃত্যু, হাসিনা সরকারের ভূমিমন্ত্রীর দুর্নীতি, দুদক, এনবিআর প্রকল্পে দুর্নীতি, ওয়াসা, ডেসকো, এলজিডিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে তারা নিজ স্বার্থে রক্ষা করতো বলেও জানানো হয়। একইভাবে আইজিপি বেনজীরের ক্রসফায়ারে হত্যা, আর্থিক দুর্নীতি, সামিট গ্রুপকে বাঁচানোর জন্য সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডসহ আরো হাজারো ঘটনায় সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ রাখায় ভূমিকা রাখত ভারতীয় হাইকমিশন ও এডিবি বলেও জানান বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের কাছে এই তথ্য ফাঁসকারী।
উল্লেখ্য, এই মনমোহন প্রকাশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তিনি এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হওয়ার আগে থেকেই। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১ সালের ৪ অক্টোবর তার বিদায়ি অনুষ্ঠানে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশের পরিবারের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ। কেননা তার বীর পিতা ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন। আর তিনি চার বছরের অসামান্য সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে আমাদের ঋণী করেছেন।’
অন্যদিকে গোবিন্দ বরের বিরুদ্ধে রয়েছে বিশিষ্টজনদের হয়রানির অভিযোগ। গত ৩ মে গণমাধ্যমে পাঠানো এক গণস্বাক্ষর বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের এক্সটার্নাল এফেয়ার্সের টিম লিডার গোবিন্দ বর কর্তৃক মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার করে ভয়-ভীতি প্রদান ও মানবাধিকার হরণের অব্যাহত প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সমাজের বিশিষ্টজনরা। তাদের অভিযোগ, বিয়ের নামে প্রতারণা, যৌতুকের দাবি ও জোরপূর্বক বিবাহবিচ্ছেদের চাপ সইতে না পেরে সাধনা মহল আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে তার প্রাক্তন স্বামী গোবিন্দ বর মিথ্যা অভিযোগ-অপবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে সাধনা মহলকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করছেন এবং দমনমূলক সাইবার নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে আইনি হয়রানি করাচ্ছেন। সাধনা মহলের পক্ষে দাঁড়ালে লেখক ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন, মানবাধিকার আইনজীবী রওশন আরা লিনা ও সাংবাদিক ইসমাইল আহসানকেও একই পন্থায় দমনমূলক সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৬, ২৯ এবং ৩১ ধারায় অভিযুক্ত করার চেষ্টা করেছেন গোবিন্দ।
ভিক্টর ক্রিলোভা