দ্বীন বিজয়ের জন্য ওলামায়ে-কেরামদের ঐক্য বদ্ধ হওয়ার কোনা বিকল্প নেই
—অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দ্বীনের বিজয়ের জন্য ওলামায়ে কেরামদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প পথ নেই। তাদেরকে জাতির মিনার হিসেবে দাঁড়াতে হবে। আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য আল্লাহর নবী ও সাহাবায়ে কেরামদের মতো পাগলপারা হয়ে কাজ করতে হবে। রাসূল (সা.) এর সাহাবীরা দ্বীন কায়েমের জন্য জান ও মালের কুরবানিতে কোনো পরোয়া করেননি। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর এদেশে আলেম-ওলামাদের ওপর চরম জুলুম নির্যাতন চালানো হয়েছে। দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার কারণে অতীতে অনেক নবীকে বিনা অপরাধে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও জামায়াতের নেতাকর্মীসহ অসংখ্য আলেম-ওলামাদের দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করার অপরাধে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। দেশের শতকরা ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে আল্লাহর দ্বীন কায়েম হবেই হবে, ইনশাআল্লাহ। তিনি মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয় এমন কোনো কথা বলা ঠিক নয় জানিয়ে বলেন, ধারণা করে কোনো কথা বলতে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে নিষেধ করেছেন। এসময় সঠিক কথা মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে ইমাম-খতিবদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। রোববার (২৬ জানুয়ারি) সকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফুলতলা উপজেলা শাখার উদ্যোগে উপজেলার চাষী কল্যাণ ট্রাস্ট চত্বরে ইমাম ও খতিব সম্মেলন-২০২৫ এ প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।
ফুলতলা উপজেলা আমীর আব্দুল আলিম মোল্লার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, প্রিন্সিপাল গাউসুল আযম হাদী, শেখ সিরাজুল ইসলাম। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন মোস্তফা আল মুজাহিদ, সৈয়দ হাসান মাহমুদ টিটো, মাওলানা শেখ ওবায়দুল্লাহ, মাওলানা সাইফুল হাসান খান, মুন্সি আব্দুস সামাদ, মুফতি নূর মোহাম্মদ, মাওলানা রফিকুল ইসলাম, হাফেজ মাওলানা আব্দুস সবুর, মাওলানা ওমর ফারুক, হাফেজ মাওলানা সেলিম রেজা, ইউপি সদ্য হাফেজ মো. গোলাম মোস্তফা, মাওলনা আবুল বাশার জিহাদী প্রমুখ।
সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, বর্তমানে সমাজকে মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এ অবস্থা একদিনে করা হয়নি। এর কিছু দায় ওলামাদেরকে নিতেই হবে। পবিত্র কুরআনের তাফসির বা হুবহু বাংলা অনুবাদও যদি কেউ একবার পড়েন তাহলে তা তার হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, মসজিদে নববীই ছিল রাসুল (সা.) পার্লামেন্ট, মসজিদই ছিল কেবিনেট। সেখানে বসেই সবকিছু পরামর্শ করা হতো, সেখানেই তিনি বিচার করতেন। এখন মসজিদে ইমাম-খতিব বয়ান দেন তা অনেকেই মিস করেন। পবিত্র জুমার যে প্রাণশক্তি তা পরিষ্কার করা হয়নি।
ওলামায়ে কেরাম এক হলে বাংলাদেশ জান্নাতে পরিণত হবে জানিয়ে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো আলেমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এত জুলুম-নির্যাতনের পরও তারা কীভাবে এত শান্ত থাকতে পারেন! তারা বিশ্বাস করেন যে, হিংসা-বিদ্বেষ আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। এসব আলেম-ওলামা যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান, তাহলে দেশ হিংসামুক্ত হবে বলে আশা করি।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে ইমামতি কোনো পেশা নয়, বরং এটা হচ্ছে একটি মহান দায়িত্ব। ‘ইমাম হচ্ছেন জিম্মাদার আর মুয়াজ্জিন হচ্ছেন আমানতদার। এছাড়া সমাজের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে মুসল্লিদের সম্পৃক্ত করে নেতৃত্ব দেওয়াও ইমাম খতিবদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু ইমামতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, তাই ইমামকে এ কাজের জন্য যেমন যোগ্য হতে হবে তেমনি তাকে মহত গুণের অধিকারীও হতে হবে। ইমামগণ জনসাধারণকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান দানের পাশাপাশি তাদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করবেন। মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন দিক যেমন-প্রথমত, তাদের আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেওয়া, আত্মসমালোচনা করতে শেখানো, বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশিক্ষণ দেয়া। এতে করে সমাজ থেকে নিরক্ষরতা দূর হবে, মাদকাসক্তি দূর হবে, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হবে, আর এসব কিছু তখনই সম্ভব হবে যদি একজন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুসল্লিদের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নামাজের মাসআলা-মাসায়েল শেখানো, বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত শেখানো, নামাজের শুদ্ধ পদ্ধতি দেখানো, হালাল-হারাম সম্পর্কে অবহিত করাও ইমামের অন্যতম দায়িত্ব।
অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ইমামের ভাষাগত দক্ষতা থাকতে হবে। কুরআন-হাদিস ও ফেকাহ্ শাস্ত্রের জ্ঞানের পাশাপাশি মাতৃভাষায়ও ইমামকে দক্ষ হতে হবে। মাতৃভাষায় তিনি দক্ষ না হলে ইসলামি জীবনদর্শন সম্পর্কে মুসল্লিদেরকে স্পষ্ট করে বোঝাতে পারবেন না। ইসলামের বাণী সঠিকভাবে পৌঁছানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবীকে তাদের স্বজাতির কাছে পাঠিয়েছিলেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, মাতৃভাষায় দক্ষ হওয়াও আলেম সমাজের কর্তব্য। মসজিদে নববিতে আখেরি নবি সাইয়্যেদুল মুরসালিন ইমামুল আম্বিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আজীবন ইমামের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। মসজিদে নববিকে তিনি শুধু নামাজের জন্য সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং সমাজ উন্নয়নের যাবতীয় কর্মকা-ের জন্য তিনি তা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আমরা যদি প্রতিটি মসজিদকে নবিজির দেখানো সেই মসজিদে নববির রোল মডেল রূপে গড়ে তুলতে পারি তাহলে আমাদের সমাজ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে, সমাজ থেকে নিরক্ষরতা দূর হবে, সমাজে ব্যাপকভাবে জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে