fbpx
হোম জাতীয় দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতে সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন
দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতে সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন

দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতে সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন

0

নেপথ্যে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব
ঢাকার দেওয়ানী ও ফৌজদারি আদালতে আধিপত্য বিস্তার করে তদ্বির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্মসচিব শেখ গোলাম মাহবুবের বিরুদ্ধে। তাঁর নেতৃত্বে গত কয়েক বছর ধরে আইনজীবিদের সমন্বয়ে একটি চক্র সক্রিয় ছিল।
বাংলাদেশ পোস্ট-এর পক্ষ থেকে এই চক্রের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে গত ১৩ আগস্ট যুগ্ম-সচিব শেখ গোলাম মাহবুবকে সরকারের আইন বিভাগ থেকে প্রথমে আইন কমিশনে (প্রেষণে) এবং পরবর্তীতে ২৯ আগস্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল কুষ্টিয়ার বিচারক নিযুক্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবী, ৫ আগস্টের সাবেক সরকার পতনের পর এই যুগ্ম সচিব তাঁর অপকর্ম প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশংকায় দৃশ্যপট থেকে আড়ালে চলে যাওয়ার জন্যই এসব বদলীর নাটক সাজান। এখন তিনি কুষ্টিয়ায় আরামে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফৌজদারি মামলায় জামিন ও আসামী খালাসে সাবেক চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম চৌধুরীসহ যুগ্মসচিবের তিন ভাইবোন ফাতিমা আক্তার, শেখ গোলাম মাহমুদ ও শেখ গোলাম মাকসুদের (তিন ভাইবোনই এ্যাডভোকেট) সমন্বয়ে গঠিত চক্রটি আদালত পাড়ায় একচেটিয়া রাজত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন ব্যাংকে প্যানেল আইনজীবী নিযুক্ত করেছেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গণমাধ্যমে পাঠানো এক অভিযোগ পত্রে সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ গোলাম মাহবুবের একচ্ছত্র আধিপত্যের বর্ণনাতে এমনটাই লেখা হয়েছে। যেখানে অভিযোগকারী নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন। তবে বাংলাদেশ পোস্ট-এর পক্ষ থেকে অভিযোগ দাতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ব্যক্তি স্বার্থের জন্য এটি করা হয়নি; সাধারণ মানুষের সু-বিচার নিশ্চিত করতেই অভিযোগটি করা হয়েছে। যেহেতু আমরা আইন পেশার সাথে জড়িত; সেহেতু আদালতের যে বিষয়গুলোতে অনিয়ম হয়েছে তা আমারা ভালভাবে অবগত।”
এছাড়া সাবেক যুগ্মসচিব এবং ওনার পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত আরেকজন ব্যক্তির নাম অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম। বাংলাদেশ পোস্ট-কে তিনি বলেন, “অভিযোগে পত্রে যে সকল বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এর অধিকাংশ ঘটনার সাক্ষী এবং প্রত্যক্ষদর্শী আমি নিজেও একজন হওয়ায় বিষয়গুলোতে একমত পোষণ করছি।”
রবিউল ইসলাম আরও জানান, “যুগ্ম সচিব এবং পরিবারের সদস্য অ্যাডভোকেট ফাতিমা আক্তারসহ তাঁর সিন্ডিকেট তদ্বির বাণিজ্যের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। যুগ্মসচিব শেখ গোলাম মাহবুব সকল প্রকার অবৈধ লেনদেন ফাতেমা আক্তার-এর মাধ্যমে করেছেন এবং সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বোন সাজিদা বানু, শিরিন আক্তার এবং বান্ধবী মোরশেদা রহমান খানের সহযোগিতা নিয়েছিলেন।”

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পরিবারের এই তিন সদস্যকে বিভিন্ন ব্যাংকে প্যানেল আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে সিটি ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এন সি সি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক।
পাশাপাশি, ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ (দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও সপ্তম), ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, পরিবেশ আদালত এবং সিনিয়র সহকারী জজ (সাভার) আদালতে চলমান অধিকাংশ সিভিল মামলায় ফাতিমা আক্তারকে দেওয়ানী কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মামলা পরিচালনায় সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ফরচুনা এ্যাপারেলস লিমিটেডের ২০০৯ সালের একটি মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা ঢাকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতে দায়ের করা হয়েছিল (মোকদ্দমা নং ১৬১৪/২০০৯)। যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফাতিমা আক্তারকে সিভিল অ্যাডভোকেট কমিশনার নিযুক্ত করে কোম্পানি বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। এছাড়াও সাবেক এই যুগ্ম সচিবের সহায়তায় গাজীপুরের কুনিয়া তারগাছে অবস্থিত ফরচুনা গ্রীন প্রজেক্টের জমি ক্রয় ও নিয়ম না মেনে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ আছে, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ গোলাম মাহবুব বোন অ্যাডভোকেট ফাতিমা আক্তারকে ফরচুনা গ্রুপ ও ইউ এইচ ওয়াই সাইফুল শামসুল আলম এন্ড কোম্পানির প্যানেল আইনজীবী নিযুক্ত করে ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় তদ্বির কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।
ইউ এইচ ওয়াই সাইফুল শামসুল আলম এন্ড কোম্পানির মামলা দেখভালের দায়িত্বে থাকা আজিজ বাংলাদেশ পোস্ট-কে জানান, “ফাতিমা আক্তার আমাদের একটি মামলায় আদালত কর্তৃক নিযুক্ত কমিশনার ছিলেন; সেখানে-তো আমাদের কিছু করার নাই; বিষয়টি আদালত নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”

তবে আইনজীবীরা বলছেন, সব কিছুর পিছনেই যুগ্মসচিবের হাত ছিল। নূনতম ৫ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকার পরেও অধিকাংশ মামলায় সিভিল কমিশনার হিসাবে অ্যাডভোকেট ফাতিমা আক্তারকে নিযুক্ত করার পিছনে ক্ষমতার অপব্যবহার; রায়ে হস্তক্ষেপ বা সুবিধা নেয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
এছাড়া ঢাকার চতুর্থ যুগ্ম জেলা জজ আদালতের মামলা নং ২২২/২০১০ ও ১০৯৪/২০১০ এবং ১০০৯/১২ (ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল) এ মামলাগুলোতে সাবেক এই যুগ্মসচিব ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বোন অ্যাডভোকেট ফাতিমা আক্তারকে কমিশনার নিযুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সেই সাথে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ ও পরিবেশ আদালত এবং সিনিয়র সহকারী জজ কোর্ট সাভার আদালতে চলমান অধিকাংশ সিভিল মামলার দেওয়ানী কমিশনার হিসেবে তিনি ফাতিমা আক্তারকে নিয়োগ দিতে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়কে বাধ্য করেছেন বলে অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে।
ঢাকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতের সেরেস্তায় গিয়ে রেজিস্টার পর্যালোচনা করেও দেখা যায় অধিকাংশ দেওয়ানী মামলার অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন ফাতিমা আক্তার।

সংশ্লিষ্টদের দাবী, ফাতিমা আক্তার যেসব মামলায় দেওয়ানী এ্যাডভোকেট কমিশনার হিসেবে সাক্ষ্য গ্রহণ বা দায়িত্ব পালন করেছেন সেসব মামলায় বিচারকের সাথে আঁতাত করে অর্থের বিনিময়ে রায়ে হস্তক্ষেপ করে বিচার ব্যবস্থায় অন্যায়ের সাম্রাজ্য তৈরি করেছেন।
ঢাকার আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সাথে কথা বলে জানা যায়, যুগ্মসচিবের বিচারক সিন্ডিকেট আলমগীর হোসেন, চতুর্থ যুগ্ম জেলা জজ আদালত-তৎকালীন বিচারক মাসুদুর রহমান, পরিবেশ আদালতের জাকির হোসেন টিপু, সিনিয়র সহকারী জজ-সাভার আদালতের তৎকালীন জাকির হোসেন সিয়াম নিজ ক্ষমতা বলে বিজ্ঞ আইনজীবীদের বঞ্চিত করে ফাতিমা আক্তারকে অ্যাডভোকেট কমিশনার নিযুক্ত করে নিজেরাও আর্থিক ভাবে লাভবান হয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলায় দ্রুত জামিন এবং খালাস বাণিজ্য করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন যুগ্মসচিব। এ কাজে ফাতিমা আক্তার ও কোর্ট এজেন্ট অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন বিচার প্রার্থীদের সাথে টাকা পয়সার লেনদেন করেন।

সম্প্রতি ‘ঢাকা আইনজীবী সমিতি’তে আসামী আবদুর রহমান চক্রটির বিরুদ্ধে ৩২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন। এখানে অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন আসামী পক্ষের আইনজীবী ছিলেন। জানা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৮ এর মামলা নম্বর ০৪/২০২০ থেকে অন্যতম আসামীকে টাকার বিনিময়ে খালাস করার কথা দেয় চক্রটি। চুক্তি অনুযায়ী তিনি খালাস না হওয়ায় এই অভিযোগপত্রটি দায়ের করেন।
এই বিষয়ে আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশ পোস্ট-কে জানান, “ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে ৩২ লক্ষ টাকা নেয়ার যে অভিযোগটি কর হয়েছিল সেটি নিষ্পত্তি হয়েছে। কোর্ট প্রাঙ্গণে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এই কাজটি করা হয়েছে। তিনি বলেন, শেখ গোলাম মাহবুবের সাথে কখনোই আমার ফোনে বা সামনাসামনি কথা হয়নি তবে আইনজীবী হিসাবে যুগ্মসচিবের বোন ফাতিমা আক্তার আমার পরিচিত।”

বাংলাদেশ পোস্ট-কে অ্যাডভোকেট ফাতিমা আক্তার নিজের বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে কমিশনার হিসাবে নিযুক্ত করার দায়িত্ব আদালতের। আমার বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ আনা হয়েছে তার কোন ভিত্তি নেই। উদ্দেশ্যমূলক ভাবে অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম রবি এই অভিযোগ করেছেন।” তিনি আরো বলেন, “রবি আমার চেম্বারে জুনিয়রশিপ করেছেন সেই সুবাদে পরিবারের যাতায়াত ছিল।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “রবির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতনে দমন ট্রাইবুনাল-৫ একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে। এই মামলায় ভাই যুগ্ম সচিব শেখ গোলাম মাহবুব তদ্বির না করায় আমাদের পরিবারের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন।”
সাবেক যুগ্মসচিব শেখ গোলাম মাহবুবের সাথে ই-মেইল মুঠোফোন এবং ঢাকার লালমাটিয়াতে অবস্থিত ফ্লাটে গিয়েও অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ সরকারের সহকারী এটর্নি জেনারেল ইব্রাহিম খলিল সাথে কথা হয় বাংলাদেশ পোস্ট প্রতিবেদকের, তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিল সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, সচিব মোঃ গোলাম সারওয়ার(ওএসডি), সাবেক যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১) বিকাশ কুমার সাহা, সাবেক যুগ্ম সচিব (বাজেট) হুমায়ুন কবির, যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-২) শেখ গোলাম মাহবুব প্রমুখ। এর বাইরেও বেশ কয়েকজন বিচারক বিচার বিভাগের এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাদের ইশারায় বিচারকদের বদলি-পদোন্নতি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, অনুগত হয়ে কাজ না করলেই বিভাগীয় মামলা, বহিষ্কার ও স্বেচ্ছায় অবসরে পাঠানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। আবার এই সিন্ডিকেটের অনেকেই প্রেষণে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার জন্য নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন।

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *