খলনায়ক থেকে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের নায়ক
চিত্রনায়ক জসীমের চলে যাওয়ার ২৬ বছর
ঢাকাই সিনেমায় তার আবির্ভাব হয়েছিল খলনায়ক হিসেবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন হিসেবে। বিশেষ করে অ্যাকশন নায়ক হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে আজও তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন। বলছি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের একসময়কার সুপারহিট নায়ক জসিমের কথা। অনেকেই তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশনের পথপ্রদর্শক হিসেবে মনে করেন।
১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে চিরবিদায় নেন চিত্রনায়ক জসীম। অল্পদিনের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রিয় নায়ক হন তিনি। তিনিই একমাত্র নায়ক, যিনি একাধারে ধুন্ধুমার অ্যাকশন দৃশ্য করে হাততালি কুড়িয়ে নিতেন আবার নায়ক হয়ে দর্শকদের আবেগে জড়াতেন, নীরবে অশ্রুবিয়োগের জন্য তার অভিনয় দাগ কাটে ঢাকাই ছবির দর্শকের মনে।
আজ ৮ অক্টোবর চিত্রনায়ক জসীমের মৃত্যুর ২৬ বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যত দিন থাকবে, তত দিন এই বাংলার মানুষ চিত্রনায়ক জসীমকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাকে ভুলে যাওয়া কঠিন।
নায়ক জসিমের জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৫০ সাল। ঢাকার কেরানীগঞ্জের বক্সনগর গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তার। জসিমের আসল নাম আবদুল খায়ের জসিম উদ্দিন।
চিত্রনায়ক পরিচয়ের আগে জসিম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন সৈনিক হিসেবে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। দুই নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে লড়েছেন এই বীর নায়ক।
বরেণ্য অভিনেতা আজিমের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন জসিম। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। এরপর ১৯৭৩ সালে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমা দিয়ে আলোচনায় আসেন জসিম। এটি ছিল কালজয়ী হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’-এর রিমেক। এতে জসিম অভিনয় করেন গাব্বার সিং-এর খলনায়ক চরিত্রে। সিনেমাটি দারুণ সফলতা পেয়েছিল। সেই সুবাদে জসিম বেশ কয়েক বছর খলনায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে কাজ করেন।
নায়ক হিসেবে জসিম আত্মপ্রকাশ করেন দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর পরিচালনায় ‘সবুজ সাথী’ সিনেমায়। এরপর টানা কাজ করে গেছেন নায়ক হিসেবে। আশির দশকে জসিম ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। প্রায় সব নায়িকার সঙ্গে জুটি বাঁধলেও শাবানা ও রোজিনার সঙ্গে জসিমের জুটিবদ্ধ সিনেমাগুলো বেশি সাফল্য পেয়েছিল।
জসিম অভিনয় দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন ‘রংবাজ’, ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’,‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘ভাইবোন’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘পরিবার’, ‘রাজা বাবু’, ‘বুকের ধন’, ‘স্বামী কেন আসামি’, ‘লাল গোলাপ’, ‘দাগী’, ‘টাইগার’,‘হাবিলদার’, ‘ভালোবাসার ঘর’ প্রভৃতি সুপারহিট সিনেমায়। সব মিলিয়ে প্রায় দুই’শ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
নায়ক জসিমই আবিষ্কার করেছিলেন আজকের নায়ক রিয়াজকে। ১৯৯৪ সালে রিয়াজ চাচাতো বোন ববিতার সাথে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) ঘুরতে এসে জসিমের নজরে পড়েন। জসিম তখন তাকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে জসিমের সাথে ‘বাংলার নায়ক’ নামের একটি সিনেমায় ১৯৯৫ সালে অভিনয় করেন রিয়াজ।
এই কালজয়ী নায়ক ও প্রযোজকের মৃত্যুর পর তাকে সম্মান জানাতে এবং আজীবন স্মরণ রাখতে এফডিসির সর্ববৃহৎ ২ নম্বর ফ্লোরকে জসিম ফ্লোর নামকরণ করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের কোনো স্বীকৃতি না পেলেও জসিম এখনো অম্লান দর্শকদের মনে। বাংলা সিনেমার দর্শকরা এখনো তাকে ভালোবাসে, মন থেকে শ্রদ্ধা করে।
বাবার স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন জসীমের তিন ছেলে- এ কে রাহুল, এ কে রাতুল ও এ কে সামী। কোলাজ: ইত্তেফাকজসিমের প্রথম স্ত্রী ছিলেন ড্রিমগার্লখ্যাত নায়িকা সুচরিতা। পরে তিনি ঢাকার প্রথম সবাক সিনেমার নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে করেন।
দুই যুগ ধরে বাবার স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন জসীমের তিন ছেলে- এ কে রাহুল, এ কে রাতুল ও এ কে সামী। বাবার পথ ধরে অভিনয়ে নাম লেখাননি তারা, কাজ করছেন সংগীতজগতে। তিনজনই যুক্ত ব্যান্ডের সঙ্গে। এর মধ্যে রাহুল ‘ট্রেনরেক’ ব্যান্ডের গিটারিস্ট ও ‘পরাহো’ ব্যান্ডের ড্রামার, রাতুল ও সামী যুক্ত আছেন ‘ওইনড’ ব্যান্ডের সঙ্গে। রাতুল ওইনডের ভোকালিস্ট ও বেজিস্ট, সামী ড্রামার।
ইত্তেফাক