মনিজা ইসলাম
অভিশংসন ও সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি ইস্যুটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক আলাপচারিতার কেন্দ্রবিন্দু। স্বাভাবিকভাবেই যার নাম এই ইস্যুটির সাথে যুক্ত তিনি মার্কিন মুলুকের সর্বাধিক সমালোচিত ও অযোগ্য সাবেক রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার এই ইস্যু আরো বেশি চাঙ্গা হয় গত ৬ জানুয়ারি ট্রাম্প সমর্থক দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটাল হিলে হামলার মাধ্যমে। মার্কিন ইতিহাসে এর আগে এই ধরণের হামলা আরও একবার হয়েছিল ইংরেজ সৈন্য কর্তৃক ১৮১৪ সালে। কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে সংবিধান লংঘন, গুরুতর অসদাচরণ বা কোনো ধরণের দুর্নীতি জন্য পার্লামেন্ট কর্তৃক অপসারিত হয় তখন তাকে অভিশংসন বলে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক অভিশংসিত হন। প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ তোলেন।
প্রথমত, ট্রাম্প ইউক্রেনের সামরিক সহায়তার অর্থ আটকিয়ে দেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাথে নির্ধারিত বৈঠক কালক্ষেপন করেন। ইউক্রেন সরকারের বিরুদ্ধে এই ধরণের চাপ সৃষ্টির অন্যতম কারণ ছিল – ইউক্রেন সরকার যাতে জো বাইডেনের বিষয় তদন্তের ঘোষণা দেয়। কেননা ট্রাম্পের মনে সংশয় ছিল জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তার পরাজিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকে।
আর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার অর্থাৎ তিনি কংগ্রেসের বিচার কাজে বাধা প্রদান করেন। ট্রাম্প তার অভিশংসনের শুনানিতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের সাক্ষী দিতে বাধা দেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয় তা আমেরিকার মতো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব।
ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসনের শুনানি শুরু হয় ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। পরবর্তী – অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে শুনানি হয় এবং ডিসেম্বর মাসে তাঁর অভিশংসন হয়। ট্রাম্পের পরবর্তী বিচারকার্য শুরু হবে ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। দ্বিতীয় দফায় কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিশংসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম।
এই বিচার কাজ কোন প্রক্রিয়ায় হবে সেটি স্থির করবেন যথাক্রমে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দলের দুই জ্যেষ্ঠ সিনেটর মিজ ম্যাক্কোনেল এবং চাক সুমার। একই সাথে বিচারকার্যের সভাপতিত্ব করবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস। সিনেটের ১০০ সদস্য, বিচার ও জুরি বোর্ড এই বিচার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করবেন।
এখন প্রশ্ন হলো, এই অভিশংসন কতটুকু যোক্তিক ? সাবেক কোনো প্রেসিডেন্টের অভিশংসন কি সাংবিধানিক ? অন্যদিকে এই অভিশংসন বেশ জটিল। সিনেটের দুই -তৃতীয়াংশ সমর্থন ছাড়া এই অভিশংসন সম্ভব নয়। অর্থাৎ ১০০ জন সিনেটরের মধ্যে ৬৭ জন সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন। সিনেটে ৪৭ জন ডেমোক্র্যাট ও ৫৩ জন রিপাবলিকান হওয়ায় ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়া বেশ জটিল হবে এই ধারণা অমূলক নয়।
অন্যদিকে রিপাবলিকান সমর্থক সিনেটর রেইনড পল সিনেটের এক প্রস্তাবে বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিশংসন সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। কেননা ট্রাম্প এখন একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন সাধারণ নাগরিকের সাথে তার কোনো বৈসাদৃশ্য নেই। কিন্তু তার এই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায় ৫৫ (ডেমোক্র্যাট ) ও ৪৫ (রিপাবলিকান ) ভোটে। ট্রাম্পের নিজ দলের ৫ জন সিনেটরের বিরোধিতায় বাতিল হয়ে যায় পলের প্রস্তাব।
এখন আমাদের অপেক্ষার পালা , দুই -তৃতীয়াংশ সিনেটর ট্রাম্পের অভিশংসন চায় কিনা। এখানে ১৭ জন রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থন নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসন। যা অভিশংসন ইতিহাসে সৃষ্টি করবে নতুন মাত্রা।
লেখক: গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক