লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান ওএএম
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন এমন এক রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে, যা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: কোনো রাষ্ট্র কি নিজেকে গণতন্ত্রের ধারক বলে দাবি করতে পারে, যখন তার রাজনৈতিক নেতারা নিজ দেশের ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অনিচ্ছুক এবং একই সময়ে ফিলিস্তিনিরা দখলদারত্ব, বাস্তুচ্যুতি ও ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হতে থাকে?নির্বাচনে প্রধান দুটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের কোনোটিই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তবে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো অভূতপূর্ব নির্বাচনী শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে, যা তাদের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা পালনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাদের এই সাফল্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, নাকি জাতিগত বর্জনের ওপর প্রতিষ্ঠিত—তা যাচাই করার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
অনিশ্চিত নির্বাচনী ফলাফল ও বিভক্ত সংসদ
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যবিশিষ্ট নেসেটে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তত ৬১টি
আসন প্রয়োজন। প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫৪টি আসন পেয়েছেন। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন
বিরোধী জোট ৪৮টি এবং আরব-নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম সম্মিলিতভাবে ১৮টি আসন
পেয়েছে।
এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক সংকটের মূল চিত্র তুলে ধরে। নেতানিয়াহুর জোট বৃহত্তম হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। আইজেনকটের বিরোধী জোটও প্রয়োজনীয় সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি। অতিরিক্ত সমর্থন অর্জন, প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের সদস্যদের সহযোগিতায় রাজি করানো অথবা আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করা ছাড়া কোনো পক্ষের পক্ষেই সরকার গঠন করা সম্ভব নয়।নেতানিয়াহু একটি ডানপন্থী সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে আইজেনকট কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বৃহত্তর জোট গঠন অথবা নতুন নির্বাচন—কোনোটির সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরব দলগুলোর উত্থান: সরকার গঠনে নির্ণায়ক শক্তি
নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর
নির্বাচনী সাফল্য। তাদের সম্ভাব্য ২০টি আসন ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ অর্জনের
প্রতিনিধিত্ব করবে। এর মাধ্যমে আরব ভোটারদের বর্ধিত অংশগ্রহণ এবং দেশের রাজনৈতিক
গতিপথে প্রভাব বিস্তারের দৃঢ় সংকল্প প্রতিফলিত হয়েছে। সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি
প্রায় ৭৮ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে; আরব ভোটারদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ দেখা গেছে।
ইসরায়েলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচলিত। ভোটাররা
ব্যক্তিগত নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীদের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন।
নির্ধারিত ন্যূনতম ভোটের সীমা পূরণ সাপেক্ষে দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে
সংসদীয় আসন লাভ করে এবং দলীয় তালিকার ক্রমানুসারে প্রার্থীরা নেসেটে প্রবেশ
করেন।
তাই আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য ইসরায়েলের সামনে একটি
গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরীক্ষা হাজির করেছে। তাদের ভোট কি দেশের গণতান্ত্রিক
জনমতের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, নাকি রাজনৈতিক ও জাতিগত বিভক্তি তাদের কার্যকর প্রভাব
বিস্তারের পথ রুদ্ধ করবে?
আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান কি বর্ণবাদ?
আরব দল বালাদের নেতা সামি আবু শাহাদেহ যুক্তি দিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা
থেকে সরানোর লক্ষ্যে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করতে ইসরায়েলের
বিরোধী নেতাদের অনীহার পেছনে বর্ণবাদ কাজ করছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যে
তিনি এমন একটি জনগোষ্ঠীকে সরকার পরিচালনার সম্ভাবনা থেকে বাদ দেওয়ার সমালোচনা
করেন, যারা
দেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
তা'আলের
নেতা আহমদ তিবিও বলেছেন, নেসেটের স্পিকার পরিবর্তনের বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা
করতে বিরোধী পক্ষ তাঁর রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। এসব ঘটনা ইঙ্গিত
দেয় যে আনুষ্ঠানিক সরকার গঠনের জোট নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিক যোগাযোগ ও
সমঝোতার সুযোগ রয়েছে।
প্রধান ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে
অনীহা ইসরায়েলের গণতন্ত্র এবং আরব নাগরিকদের নাগরিক অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
তুলেছে। কেবল আরব পরিচয়ের কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রত্যাখ্যান করা হলে
সমান প্রতিনিধিত্বের নীতি লঙ্ঘিত হবে।
এই নির্বাচন সেই নীতিকে কঠোর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিরোধী দলগুলো যদি
নিজেদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে গণতন্ত্রের প্রতি
তাদের অঙ্গীকার বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ইসরায়েলের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য
বিষয়। তাঁর জোট সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী
দলগুলোর সদস্যদের নিজের পক্ষে টেনে আনা অথবা অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে
সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।
তাঁর আইনি জটিলতাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ
আদালত (আইসিসি) ফিলিস্তিন পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী
অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের
বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
নেতানিয়াহু নিজ দেশেও দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যুক্তি দিয়েছেন, পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে।তবে রাজনৈতিক জবাবদিহি কেবল নির্বাচনী আসনের হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে নয়, বরং আইনসম্মত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বার্থ রক্ষার জন্য আইনের শাসন মেনে চলা, বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ তদন্ত করা এবং যথাযথ বিচারিক পর্যালোচনা গ্রহণ করা অপরিহার্য।তাই বিরোধী দলগুলোর সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে: একটি কার্যকর বিকল্প সরকার গঠন করা এবং একই সঙ্গে প্রমাণ করা যে জবাবদিহির প্রতি তাদের অঙ্গীকার কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গাজা ও পশ্চিম তীর: অমীমাংসিত মানবিক সংকট
ইসরায়েলের নির্বাচনের তাৎপর্য গাজায় যুদ্ধের বিধ্বংসী পরিণতি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের চলমান সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না ফিলিস্তিনিরা ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, বাড়িঘর ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস, চলাচল ও অত্যাবশ্যকীয় সরবরাহের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ এবং অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির শিকার হয়েছেন। পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ ও তাদের পৈতৃক ভূমিতে বসবাসের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ব্যবস্থা আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর গুরুতর তাৎপর্য রয়েছে।এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো মানবিক সংকটের জরুরিতা কিংবা জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে না। বরং এগুলো আন্তর্জাতিক আইন ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং গুরুতর লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ তদন্তের গুরুত্ব আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে।গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের জন্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব তাদের বেঁচে থাকা, আশ্রয়, চলাচলের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা এবং বাস্তুচ্যুতি বা সহিংসতার অবিরাম হুমকি ছাড়া জীবনযাপনের অধিকারের ওপর পড়ছে।পরিস্থিতির অর্থবহ উন্নতির জন্য সামরিক কর্মকাণ্ডে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ, জবর দখলের মাধ্যমে বসতি নীতি পুনর্বিবেচনা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য।বসতি সম্প্রসারণ, বৈষম্য ও ফিলিস্তিনি ভূমির ভবিষ্যৎ
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান বাধা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক অংশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলে